## শিশুর গলা বসে গেলে করণীয়
বাবা-মা হিসেবে, আমাদের সবসময়ই চেষ্টা থাকে নিজেদের আদরের সন্তানের সুস্থতা নিশ্চিত করা। একটুখানি কাশি বা গলা ব্যাথা দেখলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। আর যদি দেখেন আপনার ছোট্ট সোনার গলা বসে গেছে, তাহলে চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে শীতকালে বা ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশুদের ঠান্ডা লাগা, কাশি হওয়া, গলা ব্যথা এবং গলা বসে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো দেখা যায়। কিন্তু ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আজকের ব্লগ পোস্টে আমরা শিশুর গলা বসে গেলে কী কী করণীয়, সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
**গলা বসার কারণগুলো কী কী?**
শিশুর গলা বসার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কারণগুলো জানলে, প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। প্রধান কয়েকটি কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
* ভাইরাস সংক্রমণ: ঠান্ডা লাগা বা ফ্লু এর কারণে শিশুর গলা বসে যেতে পারে। রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (RSV) বা প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এক্ষেত্রে দায়ী হতে পারে।
* ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ: স্ট্রেপ্টোকক্কাস (Strep throat) এর মতো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণেও গলা ব্যথা এবং গলা বসে যেতে পারে।
* অ্যালার্জি: ধুলোবালি, পরাগরেণু বা অন্য কোনো অ্যালার্জির কারণেও শিশুর গলায় সমস্যা হতে পারে।
* শুষ্ক বাতাস: শীতকালে বা এসির কারণে বাতাস শুষ্ক হয়ে গেলে শিশুর গলায় অস্বস্তি হতে পারে এবং গলা বসে যেতে পারে।
* চিৎকার বা অতিরিক্ত কথা বলা: অনেকক্ষণ ধরে চিৎকার করলে বা একটানা কথা বললে গলার স্বরভঙ্গ হতে পারে।
* গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স (GERD): পেটের অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে আসার কারণেও গলায় সমস্যা হতে পারে।
**শিশুর গলা বসে গেলে বুঝবেন কিভাবে? লক্ষণগুলো চিনে নিন**
গলা বসলে শিশুরা সাধারণত নিজেদের সমস্যাগুলো বুঝিয়ে বলতে পারে না। তাই কিছু লক্ষণ দেখে আপনাকে বুঝতে হবে:
* গলার স্বর পরিবর্তন: গলার আওয়াজ ভারী বা ভাঙা শোনাতে পারে।
* কাশি: শুকনো কাশি বা কফযুক্ত কাশি হতে পারে।
* গলা ব্যথা: খাবার গিলতে বা কথা বলতে অসুবিধা হতে পারে।
* খুসখুসে ভাব: গলায় অস্বস্তি বা খুসখুসে অনুভূতি হতে পারে।
* অস্বস্তি: শিশু অস্থির বা বিরক্ত হতে পারে।
* জ্বর: অনেক সময় জ্বরের সাথে গলা বসার সমস্যা দেখা যায়।
**গলা বসলে বাড়িতে কী কী চিকিৎসা করা যেতে পারে?**
শিশুর গলা বসলে ঘরোয়া কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করে আরাম দেওয়া যেতে পারে। তবে, সমস্যা গুরুতর হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
* **পর্যাপ্ত বিশ্রাম:** শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে দিন। ঘুমের অভাবে শরীর দুর্বল হয়ে গেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
* **গরম তরল খাবার:** গরম স্যুপ, হালকা গরম দুধ, মধু মেশানো হালকা গরম পানি অথবা চিকেন স্যুপ খাওয়ালে শিশুর গলা আরাম পাবে।
* **হিউমিডিফায়ার ব্যবহার:** ঘরে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করলে বাতাস আর্দ্র থাকবে এবং শিশুর গলায় আরাম লাগবে। যদি হিউমিডিফায়ার না থাকে, তাহলে গরম পানির ভাপ নিতে পারেন।
* **মধু:** এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য মধু খুবই উপকারী। মধু কাশি কমাতে সাহায্য করে এবং গলা ব্যথা কমায়। সরাসরি অথবা হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে মধু দিতে পারেন।
* **স্যালাইন ওয়াটার গার্গল (Saline water gargle):** বড় বাচ্চাদের হালকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গার্গল করতে দিন। এতে গলার ইনফেকশন কম হবে। ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা করানো সম্ভব নয়।
* **প্রচুর পানি পান করানো:** শিশুকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করান। পানি শরীরকে ডিহাইড্রেশন থেকে রক্ষা করে এবং গলাকে ভেজা রাখে।
* **ঠান্ডা খাবার এড়িয়ে চলুন:** ঠান্ডা খাবার বা পানীয় শিশুর গলা ব্যথা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
* **ধোঁয়া ও দূষণ থেকে দূরে রাখুন:** শিশুকে ধোঁয়া, ধুলোবালি এবং দূষণ থেকে দূরে রাখুন। সিগারেটের ধোঁয়া শিশুর জন্য খুবই ক্ষতিকর।
**বয়স ভেদে যত্ন:**
* **৬ মাসের কম বয়সী শিশু:** এই বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
* **৬ মাস থেকে ১ বছর বয়সী শিশু:** বুকের দুধের পাশাপাশি হালকা গরম পানি, ফলের রস, এবং পাতলা স্যুপ দিতে পারেন।
* **১ বছরের বেশি বয়সী শিশু:** উপরের সবকিছুর পাশাপাশি মধু, হালকা গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে দিতে পারেন।
**কখন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে?**
সাধারণত ঘরোয়া চিকিৎসাতেই শিশুর গলা বসা সেরে যায়। তবে, কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:
* শ্বাসকষ্ট হলে।
* খাবার গিলতে খুব অসুবিধা হলে।
* জ্বর ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট এর বেশি হলে।
* শিশুর শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেলে।
* গলা ব্যথা কয়েকদিনের বেশি থাকলে।
* কাশি বেশি বেড়ে গেলে।
* শিশুর মুখ দিয়ে লালা পরতে থাকলে।
* শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো আওয়াজ হলে।
**প্রতিরোধের উপায়:**
কিছু সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করে শিশুর গলা বসা প্রতিরোধ করা যেতে পারে:
* নিয়মিত হাত ধোয়া: শিশুকে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
* টিকা দেওয়া: সময় মতো সব টিকা দিন।
* ভিড় এড়িয়ে চলা: অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
* পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা: ঘরবাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন।
* ধূমপান পরিহার করা: শিশুর আশেপাশে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকুন।
শিশুর সামান্য অসুস্থতাতেও বাবা-মায়ের মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। তবে, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চললে আপনার আদরের সন্তান দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। আমাদের ওয়েবসাইটে আপনারা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর ও শিক্ষণীয় পণ্য খুঁজে পাবেন যা আপনার শিশুর সুস্থ ও সুন্দর বিকাশে সাহায্য করবে। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন!

Leave a Reply